অরুণাভ দত্ত, বালুরঘাট:- দক্ষিণ দিনাজপুরের গঙ্গারামপুরের শিববাড়ি সংলগ্ন বারুণী স্নান ও মেলা উত্তরবঙ্গের অন্যতম প্রাচীন এবং ঐতিহ্যবাহী উৎসব। স্থানীয় ইতিহাস অনুযায়ী, এই মেলার উৎপত্তি প্রায় ৫০০ বছরেরও বেশি সময় আগে, যা বান রাজার শাসনকালের স্মৃতিকে আজও জীবন্ত করে রেখেছে।
এই উৎসব শুধুমাত্র একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, এটি স্থানীয় সংস্কৃতি, ঐতিহ্য এবং মানুষের আবেগের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। প্রতি বছর দোলপূর্ণিমার ১২ দিন পর মধুকৃষ্ণা ত্রয়োদশী তিথিতে পুনর্ভবা নদীর পবিত্র জলে পুণ্যার্থীদের স্নানের মাধ্যমে এই বারুণী উৎসবের সূচনা হয়।
হিন্দু শাস্ত্র মতে, এই দিনে স্নান করলে পাপমোচন হয় এবং আধ্যাত্মিক শুদ্ধি লাভ হয়। স্কন্দ পুরাণ অনুসারে, চৈত্র মাসের কৃষ্ণপক্ষের ত্রয়োদশী তিথিতে শতভিষা নক্ষত্র যুক্ত হলে সেই তিথিকে বারুণী বলা হয়। হিমালয়কন্যা গঙ্গার অপর নাম বারুণী, তাই এই দিনে পুনর্ভবা নদীর জলে স্নান গঙ্গাস্নানের সমতুল্য বলে বিবেচিত।
বিশ্বাস করা হয়, যদি এই তিথি শনিবারে পড়ে, তবে তা "মহা বারুণী স্নানে" রূপান্তরিত হয়, যা আরও বেশি পুণ্যদানকারী।
বারুণী স্নান উপলক্ষে শিববাড়ি প্রাঙ্গণে বসে বিশাল মেলা। মেলায় নাগরদোলা, খেলনা, জিলিপি, মিষ্টি, খাবারের দোকান এবং নানান হস্তশিল্পের পসরা এক ভিন্ন মাত্রা যোগ করে। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা তাদের পণ্যের প্রদর্শনী ও বিক্রির জন্য এই মেলায় অংশ নেন। এটি ধর্মীয় অনুষ্ঠানের পাশাপাশি স্থানীয় অর্থনীতিরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
প্রতি বছর হাজার হাজার পুণ্যার্থী পুনর্ভবা নদীতে স্নান করেন এবং শিব মন্দিরে পূজা দিয়ে পুণ্য অর্জন করেন। এই বিপুল ভিড় সামলাতে স্থানীয় প্রশাসন বিশেষ ভূমিকা পালন করে। অস্থায়ী শিবির, পানীয় জলের ব্যবস্থা এবং স্বাস্থ্য পরিষেবার মাধ্যমে পুণ্যার্থীদের সহায়তা করা হয়।
গঙ্গারামপুরের শিববাড়ির বারুণী স্নান শুধুমাত্র একটি ধর্মীয় উৎসব নয়, এটি উত্তরবঙ্গের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের এক জীবন্ত প্রতীক। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই উৎসব স্থানীয় মানুষের আবেগ ও ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতাকে ধরে রেখেছে।
মধুকৃষ্ণা ত্রয়োদশীর এই বারুণী স্নান উত্তরবঙ্গের ইতিহাস, ধর্মীয় বিশ্বাস এবং সামাজিক সম্প্রীতির এক উজ্জ্বল উদাহরণ। পাঁচ শতাব্দীর পুরনো এই ঐতিহ্য আজও সমান গুরুত্বের সঙ্গে পালিত হয় এবং ভবিষ্যতেও উত্তরবঙ্গের গর্ব হিসেবে অক্ষুণ্ণ থাকবে।


