গৌতম কুমার রায়:- মহাকালের পরিক্রমায় প্রকৃতি তার গর্ভে জন্ম দিয়েছে গতিময় বাধাহীন নদী পদ্মাকে। আবার প্রকৃতিই জন্ম দিয়েছে সাহিত্য সৃষ্টির অবিনশ্বর সার্থক পুরুষ কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে। রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য সৃষ্টির বড় একটা অংশজুড়ে রয়েছে পদ্মার উপস্থিতি। আর পদ্মার সার্থকতা রবীন্দ্রনাথের সাধনাকে পূর্ণতা দিতে পেরেছে বলে। সোমেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় যথার্থই বলেছেন, “জোড়াসাঁকোতে জন্মলাভ হলেও রবীন্দ্রনাথ যথার্থ ভূমিষ্ঠ হলেন শিলাইদহে এসে।” শিলাইদহ-শাহজাদপুর-পতিসরে এসে সঞ্চিত হয় কবিজীবনের অসামান্য উপার্জন। আর এই উপার্জন কবি রবীন্দ্রনাথকে, গল্পকার রবীন্দ্রনাথকে, চিত্রশিল্পী রবীন্দ্রনাথকে, প্রাবন্ধিক রবীন্দ্রনাথকে, সর্বোপরি মানুষ রবীন্দ্রনাথকে নতুন করে আলোকিত করে।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মস্থান কলকাতার জোড়াসাঁকোর বাড়িকে তিনি বর্ণনা করেছিলেন এক বন্দিশালা হিসেবে। নিজেই নিজেকে বলেছেন এই বন্দিশালার এক বন্দি বালক। তাঁর অবরোধ অবস্থা থেকে শৈশব কালকে মুক্ত করে এনেছিলেন গঙ্গার তীরে পেনেটের বাগানে। আর সেখান থেকেই কবির সম্পর্ক গড়ে ওঠে নদীর সাথে, নদীর জলের সাথে, উর্বরতা পলিমাটির সাথে, প্রকৃতির সাথে। এরপর গঙ্গা। তারও পরে বাংলায় এসে উচ্ছসিত হন পদ্মার প্রবাহমান জলরাশির রূপ অবলোকন করে। ভেতরে ভেতরে রবীন্দ্রনাথ হয়ে ওঠেন অবিনশ্বর সৃষ্টির রূপকার।
যৌবনকালের মহাসুরের রাগ সাধনায় কবি শিলাইদহে আসেন। কলকাতার গঙ্গা ছুঁয়ে পদ্মার জল স্পর্শ করে নৌকায় চেপে রাজশাহী হয়ে ঠিক শিলাইদহ পর্যন্ত। সম্ভবত ১৮৮৮ সালের শেষ দিকের কথা। কারো কারো মতে ১৮৭৫ সালের ডিসেম্বর মাস। শিলাইদহ আসা নিয়ে কবি এক পত্রে লিখেছেন, “শিলাইদহের অপর পাড়ে (পদ্মার উত্তরে) একটা চরের সামনে আমাদের বোট লাগানো আছে। প্রকাÐ চর ধু ধু করছেÑ কোথাও শেষ দেখা যায় না...। গ্রাম নেই, লোক নেই, তরু নেই, তৃণ নেইÑ বৈচিত্র্যের মধ্যে জায়গায় জায়গায় ফাটল ধরা ভিজে কালো মাটি, জায়গায় জায়গায় শুকনো সাদা বালি...। এমনতর সৌন্দর্য কোথাও দেখা যায় না...। পৃথিবী যে বাস্তবিক কি আশ্চর্য সুন্দরী তা কলকাতায় থাকলে ভুলে যেতে হয়।” কবি পদ্মা নদীর দু’পাড়ে সোনালি ফসলের হাসি দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন। নদীর রূপের আগুনে পুড়েছিল তাঁর অন্তরাত্মা। তাই তিনি বারবার ছুটে এসেছিলেন পদ্মার কাছে।
পদ্মার উর্বর ভূমিখÐে একে-একে ফলেছে রবীন্দ্রসৃষ্ট ফসল। রবীন্দ্রজীবনের এই উর্বর বাঁকে পদ্মার দান অতুলনীয়। প্রমথনাথ বিশী শিলাইদহে রবীন্দ্রনাথ গ্রন্থে বলেছেন, “পদ্মাকে যে দেখেনি বাংলাদেশকে দেখেনি সে, পদ্মাকে যে জানে না বাংলাদেশকে জানে না সে, পদ্মাকে যে বোঝেনি, বাংলাদেশকে বোঝেনি সে; যা কিছু দেখা জানা বোঝা সমস্ত সংহত এই নদীটির মধ্যে।” রবীন্দ্রনাথ পদ্মাকে দেখেছিলেন, অনুভব করেছিলেন, বাংলাদেশকে বুঝেছিলেন আর তাঁর সেই দেখা, বোঝা আর অনুভবের কারণে বাংলা সাহিত্যে যোগ হয়েছে অমর সৃষ্টি।
কলকাতার যান্ত্রিকতার বেড়াজাল ডিঙিয়ে দু’চোখ ভরে দেখেছিলেন পদ্মা পাড়ে গড়ে ওঠা গ্রামীণ জনপদের আবেগ-অনুভূতি। কলকল ছলছল ¯্রােতধারার ছন্দ নিজের ভেতর তৈরি করে সাহিত্য রচনার অনুপ্রেরণা। তাই প্রকৃতির মুগ্ধতাকে আকণ্ঠক পান করে তিনি বলেছিলেন, “বিশ্ব প্রকৃতির সঙ্গে ভাব করার একটা সুবিধা এই যে, সে আনন্দ দেয় কিন্তু কিছু দাবি করে না, সে তার বন্ধুত্বকে ফাঁসের মত বেঁধে ফেলতে চেষ্টা করে না, সে মানুষকে মুক্তি দেয়।”
রবীন্দ্রনাথ ছিলেন সার্থক প্রকৃতির প্রেমিক কবি। তাই তাঁর সৃষ্টিতে স্থান পেয়েছে প্রকৃতি, বিশেষ করে নদী। কবির প্রথম নদীপ্রীতির পরিচয় পাওয়া যায় শৈশবেই তিনি যখন লেখেনÑ
“আমাদের ছোটো নদী চলে বাঁকে বাঁকে
বৈশাখ মাসে তার হাঁটু জল থাকে।... ”
‘ছুটি’ গল্পের ফটিক, ‘সুভা’ গল্পের সুভা বা ‘সমাপ্তি’ গল্পের ‘মৃন্ময়ী’র কি জন্ম হতো রবীন্দ্রনাথ যদি শিলাইদহ, শাহজাদপুর বা পতিসরের সাধারণ মানুষের জীবনকাব্য না পড়তেন? আর ‘অতিথি’ গল্পের তারাপদের মতো চরিত্র সৃষ্টির পেছনে বোধহয় কাজ করেছে পদ্মা নদীর প্রবহমানতার মন্ত্র। কখনো কোথাও তাকে বেঁধে রাখা যায় না। ‘পোস্টমাস্টার’, ‘মেঘ ও রৌদ্র’ বা ‘ক্ষুধিত পাষাণে’র মতো গল্পের সৃষ্টি হয়েছে পদ্মারই পারে। ‘দেনাপাওনা’, ‘শাস্তি’, ‘স্বর্ণমৃগ’ গল্পের সৃষ্টির পেছনে রয়েছে পদ্মাপারের জনজীবন। নদী ও নৌকা দুটো শব্দের মাঝে অসংখ্য শব্দমালা গেঁথে রচনা করেছিলেন ‘নৌকাডুবি’। বলাকা কাব্যে যে গতিবাদের সন্ধান পাওয়া যায়, তা পদ্মা নদীরই ফসল। রবীন্দ্রজীবনে এটাই পদ্মার দান। রবীন্দ্রনাথ শিলাইদহে এসে জেনেছিলেন প্রকৃতিকে, মানুষকে, এ দেশকে। তাই গোরা উপন্যাসে গোরাও প্রকৃত দেশের সন্ধান পায় চরঘোষপুরে। গ্রামে গিয়ে পরিশ্রমী মানুষের সংস্পর্শে এলেই প্রকৃত শিক্ষায় শিক্ষিত হওয়া যায়, এ পাঠও তো রবীন্দ্রনাথ পেয়েছিলেন পদ্মার তীরবর্তী অঞ্চল থেকে।
শিলাইদহে প্রকৃতির নিবিড় সাহচর্য প্রবল প্রেরণা দিয়েছে চিত্রশিল্পী রবীন্দ্রনাথকে। সেসব ছবির বেশির ভাগই হারিয়ে গেছে কালের গর্ভে। বন্ধু জগদীশচন্দ্র বসুকে তাঁর ছবি আঁকার যে বর্ণনা দেন, তা থেকে অনুমান করা যেতেই পারে ছবির মূল উৎস নিজের মনের তাগিদ। যে ক’টি ছবি পাওয়া গেছে তাতে বলাবাহুল্য নিসর্গ প্রাধান্য পেয়েছে। পরবর্তীকালে যখনই রবীন্দ্রনাথ হাতে তুলে নিয়েছেন রঙ-তুলি, তখনই অধিকাংশ সময়ে এসেছে প্রকৃতির দৃশ্য এবং তা শিলাইদহের স্মৃতিকেই বহন করছে।
মানুষ সেই প্রথম থেকেই নদীর তীরকে পছন্দ করে এসেছে নানাবিধ সুবিধার কারণে। বিশেষ করে প্রতিদিনের খাদ্য, বাসস্থান, অর্থনীতি ইত্যাদির কারণে। পদ্মা যত ভাটিতে চলেছে ততই উজাড় করে দিয়েছে নিজের ভাÐারকে। কবি তাই জন্মস্থানের বেড়া ডিঙিয়ে জীবনের সার্থকতা খুঁজেছেন পদ্মার কাছে শিলাইদহে। আবার জীবনের সাথে মুক্তি, সন্ধি স্থাপনের জন্য ছুটে গেছেন শাহজাদপুর কিংবা পতিসরে। আর যাই হোক না কেন শিলাইদহ, শাহজাদপুর বা পতিসর সব ঠিকানার সাধকপীঠ পদ্মা নদী। কবি তাঁর ‘ছিন্নপত্রাবলী’র ১৪৭ পত্রে লিখেছেন, “পদ্মাকে এখন খুব জাঁকালো দেখতে হয়েছে। একেবারে বুক ফুলিয়ে চলেছেÑ ওপারটা একটিমাত্র কাজলের নীল রেখারমত দেখা যাচ্ছে। আমার ডান দিকের জানালা দিয়ে যতদূর চেয়ে দেখি নিবিড় সবুজ শস্যক্ষেত্র, বাম দিকের জানালা দিয়ে চেয়ে দেখি অপার উদার জলরাশি।... বেগবান একাগ্র গামিনী নদী আমাদের মনের ইচ্ছার মতÑ আর স্থির শান্ত সুবিস্তীর্ণ বিচিত্র শস্য শালিনী ভূমি আমাদের ইচ্ছার সামগ্রীর মত।” প্রমথনাথ বিশী ছিন্নপত্রকে পদ্মার মহাকাব্য বলে অভিহিত করেছেন। কবিমনে পদ্মা ধীরে ধীরে বাস্তব প্রকৃতিকে ¤øান করে মানস প্রকৃতির ভাব গ্রহণ করেছে। সে পরিণত হয়েছে এক মানবীয় সত্তায়, ভরা বর্ষায় কূল ভাসানো পদ্মার কাছে রবীন্দ্রনাথ খুঁজে পেয়েছেন জীবনের আশ্বাস। এগিয়ে চলার মন্ত্র।
শিলাইদহে এসে রবীন্দ্রনাথ নতুন সাহিত্য-সংগীত-চিত্রকলায় ভরিয়ে তুলেছেন তাঁর সৃষ্টির ভুবন। পুত্র রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর পিতৃস্মৃতি গ্রন্থে লিখেছেন, “...বাবার গদ্য ও পদ্য দু’রকম লেখারই উৎস যেমন খুলে গিয়েছিল শিলাইদহে, এমন আর কোথাও হয়নি। এই সময় তিনি অনর্গল কবিতা প্রবন্ধ ও গল্প লিখে গেছেনÑ একদিনের জন্যও কলম বন্ধ হয়নি। শিলাইদহের যে রূপবৈচিত্র্য, তার মধ্যে পেয়েছিলেন তিনি লেখার অনুকূল পরিবেশ।”
রবীন্দ্রনাথ খুব উপভোগ করতেন প্রাণ-চঞ্চলা ভরা পদ্মার গান। যার টলমলে যৌবন কবির অনুভূতিকে নাড়া দিয়ে গেছে বারবার। ‘সোনার তরী’ কাব্যগ্রন্থের ‘ভরা ভাদরে’ কবিতায় তুলে ধরেছেনÑ
“নদী ভরা কূলে কূলে, খেতে ভরা ধান।
আমি ভাবিতেছি বসে কী গাহিব গান।...”
১৮৯৩ সাল। বর্ষাকাল। কবি নদীপথে জল তরঙ্গের নিঃশব্দে নিজেকে ভাসিয়ে দিয়েছিলেন। লিখেছিলেনÑ লজ্জা, হৃদয় যমুনা, ব্যর্থ যৌবন, ভরা ভাদরে ও প্রত্যাখ্যান নামের কবিতাগুলো। এরপর শ্রাবণধারা। কবি পুরো সময় অতিবাহিত করেছিলেন পদ্মা নদীর বুকে। বিশেষ করে প্রমত্তা পদ্মার উদরে জন্ম নেয়া শাহজাদপুর, শিলাইদহ, রাজশাহী, নাটোরসহ উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জলাঞ্চলে। এ সময় লিখেছিলেন, “আমি শীত, গ্রীষ্ম, বর্ষা মানিনি, কতবার সমস্ত বৎসর ধরে পদ্মার আতিথ্য নিয়েছি।... বৈশাখের খররৌদ্রতাপে, শ্রাবণের মুষলধারা বর্ষণে। পরপারে ছিল ছায়াঘন পল্লীর শ্যামশ্রী, এপাড়ে ছিল বালুচরের পাÐুবর্ণ জনহীনতা, মাঝখানে পদ্মার চলমান স্রোতের পটে বুলিয়ে চলেছে দ্যুলোকের শিল্পী প্রহরে নানা বর্ণের আলোছায়ার তুলি।...” এ সময়কার কাব্যের ফসল ভরা হয়েছিল ‘সোনার তরী’তে। পদ্মা নদী আমাদের উদরপূর্তির খোরাক যেমন জোগান দিয়ে আসছে আবহমান কাল থেকে, তেমনি আবার রবীন্দ্র সৃষ্টির রসদও জোগান দিয়েছিল কবিকে।
১৯০৯ সালেই কবি শিলাইদহে বসে গীতাঞ্জলির জন্য কয়েকটি বিখ্যাত গান রচনা করেন। যেমনÑ ‘প্রভু আজই তোমার দক্ষিণ হাত’, ‘গায়ে আমার পুলক লাগে’ ‘জগতের আনন্দ যজ্ঞে আমার নিমন্ত্রণ।’
১৯০৯ সালের শীতকালে পুত্র রথীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে সাথে নিয়ে কবি শিলাইদহ থেকে বের হয়ে নদীপথ ধরে উত্তরবঙ্গ ভ্রমণে গিয়েছিলেন। এই ভ্রমণের সময় নদীর বুকে বসে লিখেছিলেনÑ “আমরা আট-নয় দিন হলো বোটে করে শিলাইদহ থেকে বেরিয়েছি। প্রথম দুই দিন গোয়ালন্দ হয়ে পদ্মা ও যমুনা বয়ে আসা গিয়েছিল। আবার বুঝি একটা সাইক্লোনের মধ্যে পড়া যাবে। তারপর বড়াল নদী দিয়ে চলন বিলে এসে পৌঁছি। বড়াল নদীটা ভারি সুন্দর।”
১৯১০ সাল। বর্ষাকালে কবি আবার পদ্মায় নৌকা ভাসিয়েছিলেন শিলাইদহ হতে। কবি পদ্মার শাখা নদী গড়াই দিয়ে সোজা গিয়েছিলে কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার কয়া ও খোকসা উপজেলার জানিপুরে। কবি একটানা প্রায় সাতদিন এই নদীর বুকে ভেসেছিলেন এবং তা নৌকাতে! কবি নদীর যৌবনা মন্ত্রে উজ্জীবিত হয়ে এখানে গীতাঞ্জলির জন্য আরো ১২টি গান লেখেন। তবে সবচেয়ে আলোচিত ও উল্লেখযোগ্য গানটা গড়াই নদীর জানিপুরে রচিত। সেটা হলোÑ
“সীমার মাঝে, অসীম তুমি বাজাও আপন সুর
আমার মধ্যে তোমার প্রকাশ তাই এত মধুর...”
কবি সব সময় নদীর প্রতি ছিলেন উদার। নদীর চলার পথকে রুদ্ধ করতে কখনোই তিনি পছন্দ করতেন না। ‘আশ্রমের রূপ ও বিকাশ’ গ্রন্থে সে সময়ের গোড়াই বা আজকের গড়াই নদীতে রেল ব্রিজ তৈরির বিষয়ে তিনি অনুভূতি বর্ণনা করেন। তিনি বলেন কীভাবে নদীর স্রোত তার তীব্র গতি দিয়ে শাসনের নামে নদী বাধাকে প্রতিরোধ করেছিল।
নদীকে শাসনের কষ্টে দেখে কবি বলেছিলেন, “ইছামতি আজ নদী নয় নালা, তিস্তা যেন এক মরুভূমি।” প্রিয় পদ্মাকে নিয়ে লিখেছিলেন, “খুব বেশি পোষ মানা নয়, কিছু বুনোরকম, সে আজ নির্জীব প্রায়।” তবু পদ্মা ছুঁয়ে আছে রবীন্দ্রনাথের অন্তরাত্মা; যার বর্হিপ্রকাশ তাঁর অমর সৃষ্টিতে।
