আপনার নিউজ:- কাঁটা তারের বেড়া। যেন ভাত আছে, ভিক্ষে দে। সভ্য যুগে অসভ্য এক বিভেদ রেখা। যেখানে ধর্মের নামে বিভক্তি। সংস্কৃতির নামে বিভক্তি। তারের এপাঁড় আর ওপাঁড় কখনও সভ্যতা কাঁদে। মানবতা সব সময় অদৃশ্যগত হয়। কেও ভারতীয়, কেও কখও পাকিস্তানী কিংবা বাংলাদেশী বা কখনও অন্য কিছু। পাসপোর্ট এবং ভিসা নামের পাতলা ক’টুকরো কাগজের কাছে হার মেনেছে জিন্না লিয়াকত আর জহরলাল নেহেরুর মত জাদ্রেল জাদ্রেল নেতা। টিকে যায় ইংরেজদের কুট্ বুদ্ধি। যদিও মহামতি মহাত্মা গান্ধি বলেছেন আগে জানলে তিনি এ ঘটনার জন্য আরো ত্যাগ নিতে প্রস্তুত হতেন। এই বেড়ার জন্য ইচ্ছে করলেই একজন মানুষ এপাঁড় ওপাঁড় আসা যাওয়া করতে না পারলেও এক বা একাধিক কুকুর, পশুপাখি, কীটপতঙ্গ অবাধে চলাফেরা করলে, একটু আধটু হৈ হুল্ল আনন্দ ছাড়া আর বাঁধা থাকে না তেমন।
মাইক ডেপলিন একজন মার্কিন পর্যটক। আমাদের দেশের ঋতুরাজ বসন্তের সাবলিলতায় প্রকৃতির মুগ্ধতা দেখতে বাংলাদেশে এসেছিলেন। তাকে আমি প্রশ্ন করেছিলাম, তোমাদের দেশে ক্রাইম হয়, আমাদের দেশেও হয়, তবে তোমরা আমাদের ক্রাইমের কারণে নাক গলাও আর আমরা তোমাদের বিষয়ে তা করি না। এমনকি তোমাদেরকে আমরা সমীহ করে কথা বলতেও ভয় পাই। না-জানি কোন কথায় তোমরা মাইন্ড করে বসো। আচ্ছা বলতে পারো আমাদের শাষন,শোষণ, অধিকার, মানবাধিকারের বিষয়ে তোমরা এত সোচ্চার কেন ? উত্তরে ডেপলিন বলেছিলেন, আসলে ক্রাইম বিশ্বের প্রায় সকল দেশেই সংঘটিত হয়ে থাকে। তবে আমাদের অর্থাৎ আমেরিকায় কোন ক্রিমিনাল ধরা পড়লে তার জন্য বিচার হয়। আর তোমাদের অর্থাৎ বাংলাদেশে ক্রাইম ধরা পড়লে ক্রিমিনালরা প্রায়শই পাড় পেয়ে যায়, কখনও কখনও ক্রিমিনালরা সেফ সেল্টারে জায়গা পায়। যেমন ৭১’র স্বাধিনতা যুদ্ধে মানবতা বিরোধি অপরাধ। অথবা জাতির জনকের হত্যার বিষটি মানবতার এই হিং¯্রতার ঘটনাটি আমরা নাকি (!) আইন করে রোহিত করে রেখেছিলাম। তবে শুধু বাংলাদেশই নয়, ওর অনেক কৌতুহল আছে ভারতীয় উপমহাদেশ ও তার ইতিহাস ঐতিহ্য নিয়ে। ১৭৫৭ সাল, নবাবের পতন। ১৯৪৭ সালে বৃটিশদের পতন। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানিদের কবর রচনার ইতিহাস। এই উপমহাদেশ নতুবা বাংলাদেশটা বারবার স্বাধীন হলো কেন ? আমি বললাম, নবাবের শাসনের কবর আমরাই রচনা করেছিলাম তাকে হত্যার মধ্য দিয়ে। যে কারণেই জন্ম হয়েছিল মীর জাফরদের মত মানুষ রূপি পশু। ভারত স্বাধীন হওয়ার কারণ আরো গভীর। বৃটিশরা এদেশ ছাড়তে চাইনি কখনও। যখন বার্মার পতন হলো তখন নেতাজী সুভাষ বোস জার্মানীতে পালিয়ে গেলেন। তিনি গঠন করলেন ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল আর্মি। দেশের আসল শক্তির আঁধার আর্মিরা যখন বৃটিশদের বিরুদ্ধে চলে গিয়েছিল তখন বৃটিশরা আর তাদের ক্ষমতা ধরে রাখতে সাহস পায়নি। তাই তারা দেশ স্বাধীনে চতুরতার আশ্রয় নেয়। দ্বিজাতি তত্বের অবতারণা করে হিন্দু-মুসলিম জাতিভেদকে সামনে এনে হানাহানি রক্তপাত এবং জীবননাশের মাধ্যমে সবকিছুকে ধ্বংশ করে, ভারতটাকে এমনভাবে বিভক্ত করে দিয়েছিল, যাতে বৃটিশরা ভারত ছেড়ে গেলেও অন্ত:বিবাদ মেটাতে তারা (বৃটিশরা) সব সময়ে বিচারকের ভূমিকায় থাকতে পারে সে ব্যব¯া’কে পাকাপোক্ত করে রেখে উপমহাদেশ স্বাধীন করে গেছে। যেন বৃটিশদের প্রযুক্তিতে তৈরী মূল্যবান আগ্নেয় অস্ত্র ভারত ও পাকিস্থান দু-দেশই কিনে এবং তা একে অপরের বিরুদ্ধে তারা ব্যবহার করবে। আর তা দেখে বৃটিশরা হাততালি বাজাতে থাকেবে এবং তাদের অতীত বুদ্ধিমান বংশধরদেরকে স্মরণ করবে, অভিনন্দন জানাবে। এই উদ্দেশ্য রূপায়িত করতে ১৯৪৭ সালে ভাগ করা হলো ভারত আর পাকিস্তান নামে দুটি রাষ্ট্রকে। ভারতীয় উপমহাদেশের এক বিশাল এলাকাকে কাঁচি দিয়ে কেঁটে দু-ভাগ করার দায়িত্ব পেয়েছিলেন মিস্টার সিরিল র্যাডক্লিফ। যিনি কখনই ভারত দেখেনই নাই। তিনি জানতেন না এখানকার কোন ভাষা,ধর্ম, সামাজিকতা বা এখানকার কোন কৃষ্টি-কালচার সম্বন্ধে। আর ইন্ডিয়াকে ভাগ করে দেওয়ার আদেশনামা দেন লর্ড মাউন্টব্যাটেন। শুধুমাত্র তাদের মনের খায়েস পূরণ করার জন্যে। দুটো জাতিগত সাম্প্রদায়িকতাতে এভাবে জন্ম দেওয়া হলো ভারত আর পাকিস্তান নামে দুটি রাষ্ট্রকে। এর পর পাকিস্থানের ইতিহাস, আরো করুন ইতিহাস। এ প্রসঙ্গে বলতে গেলে বলতে হয়, মানুষ কতকগুলো বিপদ হতে নিজেকে রক্ষা বরতে পারে না। নানা নৈরাশ্য, মৃত্যু এবং রোগকে। যা কিনা কখনও স্বাভাবিক আবার কখনও অস্বাভাবিক ভাবে ঘটেযায়। এতে মানুষ চিরদিনই পীড়িত থাকে। যে কারণেই হোক আমরা ছিলাম পাকিস্তানে। অথচ পাকিদের নৃশংসতা এমন ছিল যে তাদের পক্ষে এমন কোন কাজ ছিলনা যা করা অসম্ভব। তবে তা সব সময়ই ইসলাম নামের উগ্র ধর্মীয় আগ্রাসনের নামে। তাদের চেয়ে আর কোন ভয়ংঙ্কর জাহেলিরা যারা আজো পৃথিবীতে জন্ম নিয়েছে বলে মনে হয়না। তারা এত বড় জালেম ছিল যে, তাদের জুলুম ছিল চিতাগ্নির চেয়েও বেশি দাহিকার। যার কিনা মৃত্যুর পরশের চেয়েও ছিল হৃদয়হীন।
১৯৪৭ সালের ১৫ আগষ্ট। বৃটিশ রাজের দেয়া বুৃদ্ধির কাছে নিজেরা বিকিয়ে লাভ খুঁজতে গিয়ে কাঁটা তারের বেড়া উপহার পেয়েছেন পাকিস্তান এবং ভারত মাতার নেতৃত্ব। কাঁচি চালিয়ে মানচিত্র কেঁটে কেও ক্ষোভ আবার কেও রসনা মিটিয়েছেন। তবে বাসনা থেকে রসনা কিংবা তৃষ্ণা অথবা ক্ষোভ থেকে লোভ কোনটা নির্মূল না হলেও দিন দিন এদের প্রতি মানুষের যে ঘৃণা কিংবা ক্ষোভ যে বেড়েই চলেছে একথা ধ্রæব সত্য।এই পদ্ধতিতে মানবতা হার মানলেও টিকেছে গরু পাঁচার, মানুষ পাঁচার। মাদক এবং অস্ত্র পাঁচার। শিশু, নারী,জঙ্গি প্রবেশ। জাল টাকা,অস্ত্রের অবৈধ অনুপ্রবেশ। যে কাজ কিনা এক অসভ্য কাজ। সে কারণে আমরা এই যুগে কাঁটা তরের বেড়াকে একুবিংশ সময়ে এক অসভ্য সীমারেখা হিসেবে ভাবতে পারি। এই ৪৭’এর আগে পঞ্চগড় জেলার সদর ও বোঁদা উপজেলা, তেঁতুলিয়া ও দেবীগঞ্জ উপজেলা ভারতের পশ্চিবঙ্গের দিনাজপুর জেলার সাথে ছিল। ধর্মকে পূঁজি করে বৃটিশ রাজ কাঁচি চালিয়ে ঐ উপজেলাকে এদেশের সাথে অর্থাৎ পাকিস্তানের সাথে জোরা লাগিয়ে দিল। এলাকার মানুষের অনেকে ভারতে আবার অনেকে পাকিস্তানে পরে গেলেন। দিনে দিনে হা-হুতাশ বাড়তে লাগল। তারপর এলো কাটাতারের বেড়া। যেন সম্পর্কের আঙিনায় ব্রথার তীব্রতা জাগিয়ে গেল। আবার বছরে একবারের মিলন মেলার নামে তারের বেড়ার দুই পাশে দাড়িয়ে যেন এখন সে ব্যথার পরে লবণের ছিঁটে ছড়িয়ে দেয়া হচ্ছে। হাই বিধাতা জন্ম দিলে তবে একই সংস্কৃতির মানুষের মনে বিভেদ দিলে কেন ? ধর্মের ঘরে পাখির বিষ্টায় আপত্তি আসেনা। যদি অন্য ধর্মের পরিস্কার পরিচ্ছন্ন মানুষ প্রবেশ করতে যায় তবে তা পারবে না। কেন ? মনের মিলে, আত্মার মিলে বর্ণের মিলে তা হবে না কেন ? যদি বলি ধর্ম আমার জন্য, নাকি আমি ধর্মের জন্য। উত্তরটা কি হবে বলবেন প্লিজ !
গেল ২০ জুলাই-২০১৭, কলকাতার ‘দৈনিক আনন্দ বাজার’ পত্রিকা সংবাদে জানাচ্ছে, এদেশের গাজিপুরের আসমা বিবি স্বামীসহ গিয়েছিলেন কলকাতার বেসরকারী হাসপাতালে। দশ বছরের ছেলেকে রোগ নিরাময় করাতে। ছেলে সেখানে মারা গেল। বাবা সেই শোকে কাতর হয়ে হঠাৎ করে সেখানেই মারা গেলেন।একা আসমা বিবির মাথার পরে তখন নেমে এল বজ্রবাণ ! একা ক’টা লাশ টানবেন। তাও সেটা একমাত্র সন্তান এবং একমাত্র প্রাণপ্রিয় স্বামীর লাশ। কিভাবে তা সীমান্ত ক্রস করাবেন। মরেছে কি আইন জেঁকে বসেছে। ভারতের অভিবাসন আইন যেন রীতি আর নীতির দৌরাত্তে আসমা বিবিকে চেপে ধরেছে। তিনি কাতরে কাতরে পাথর বনে গেলেন। আসমা বিবি ¯্রফে একা কাতর হবেন নাকি আইনের জটিলতা মোকাবেলা করবেন ? ক’দিন গেলে আইন ছেলের লাশ পাড় করার অনুমতি দিল। বলুনতো স্বামীর লাশ কাকে জিম্মা করে ভারতে রাখবেন আসমা বিবি।এখানে আইন ব্যর্থ। মানবতা নিরুত্তর। শোককে ভুলে সংশয়ের যন্ত্রণা বুদ্ধিকে এগোতে দিচ্ছেনা। দ্বিজাতি তত্তে¡ দেশ ভাগ, পূর্ব পুরুষের মেনে নেয়া এই দায় আমি নেব কেন ? ধর্ম যদি দেশ ভাগের উপাদান হয়, ধর্ম যদি সংস্কৃতিকে হার মানতে বাধ্য করে তবে মানবিকতা ! তবে ধর্ম অবশ্যই ব্যবসার পণ্য। নাকি ধর্ম মানে ক্ষুদ্র গোষ্ঠিকে অধিকার বঞ্চিত করা। নাকি বরিশালের বানারিপাড়ায় চাঁদার টাকা না পেয়ে তা পুশিয়ে নিতে স্বামীকে আটকে রেখে স্ত্রীর সঙ্গমকে উপাদেয় করে চাহিদা পূরণ করা। ধিক্ ধিক্ এমন মানবজাতি কিংবা ধর্মতত্ত¡কে। আমার পূর্ব পুরুষ এবং সে সময়ে বিলাসি রাজনীতিকদের মনোবাসনার দায় অবশ্যই তাদের , তা কখনও আমার হতে পারে না।
যে ধর্ম তত্তে¡ আমি পাকিস্তানী বনে ছিলাম, ধর্মের জন্য আমি সংখ্যালঘু। আমার জন্য সমাজ আলাদা। আমার জন্য রাষ্ট্রিয় সুবিধা আলাদা। আমার মা-বোন-মেয়ের-স্ত্রীর এবং সহায় সম্পদের নিরাপত্তা ভিন্ন। আমার উপাশনালয়ে আমার অধিকার থাকে না। দেশের এক শ্রেণীর মানুষকে যদি কুরবানির পশু ভাবা হয়। সেই ধর্মের বাণিকে আওরিয়ে ১২০০ মাইল দূরে এসে ভিন্ন বৈশিষ্ট্যের মানুষের এক ধর্মের আপন, এমন চতুরতা আর ভ্রান্ত ধারণা দিয়ে তারা আমাদেরকে শাসন করে। শোষণ করে। এমনকি গণিমতির মাল ভেবে ধর্ষণ করে। এদেশের মানুষের ভয় ও লোভ দেখিয়ে সম্পদ কেড়ে নিতে আইন করে। সম্ভ্রম নেয়। আর এই যদি মানবতা হয়। এই যদি স্বাধীনতা হয়, এই যদি সভ্যতা হয়। এমনকি তাকে যদি জুলুম করে শ্রেষ্ঠ বলাতে হয়। তবে আমি তাকে ঘৃণা করবো, তবুও সুখী হবো না। তথাকথিত মানবতার ঐশ্বর্যে জীবন যাপন করতে জাতির এই নিকৃষ্ট বিভাজনে সাম্যের প্রয়োজনে সুখ পেতে নিশ্চয় কাঁটা তারের বেড়াকে মেনে নিতে পারি না। আমি জানি কাঁটাতারে কাঁটা থাকে, ৃআর তাতে থাকে শুধুইব্যথা।
🖋️গৌতম কুমার রায়
(অতিথি সম্পাদক, আপনার নিউজ)
লেখক, গবেষক, উদ্ভাবক ও পরিবেশ ব্যক্তিত্ব।
বাংলাদেশ।


